১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশে তারেক রহমান: ইতিহাসের পাতায় আজকের দিন

ঢাকা, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | Jabara News 24 বিশেষ প্রতিবেদন
দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিনের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিজি-২০২ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়।
আবেগঘন মুহূর্ত বিমানবন্দরে
বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের শীর্ষ নেতারা সকাল থেকেই বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। তার সাথে স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানও দেশে ফিরেছেন।
বিমানবন্দরে নামার পর আবেগাপ্লুত তারেক রহমান মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ফেসবুকে দেশের আকাশসীমায় প্রবেশের সাথে সাথে তিনি স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, “দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!”
সিলেট হয়ে ঢাকায়
লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ১৫ মিনিট) ছেড়ে আসা বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার প্রথমে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে অবতরণ করে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টার গ্রাউন্ড টার্নঅ্যারাউন্ডের পর বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে।
বিশেষভাবে প্রস্তুত এই ফ্লাইটে তারেক রহমানের জন্য A1 সিট বরাদ্দ করা হয়েছিল। উচ্চপদস্থ যাত্রী থাকার কারণে বিমান পরিচালনায় বিশেষ সমন্বয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
লক্ষ জনতার ঢল রাজধানীতে
তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ বিএনপি নেতা-কর্মী ও সমর্থক ঢাকায় এসেছেন তাদের প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে। বিশেষ ট্রেনসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে নেতা-কর্মীরা রাজধানীতে ভিড় করেছেন।
পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকায় বিশাল মঞ্চ তৈরি করে গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ৫০ লাখ মানুষ সমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ – বিশেষ বাসে যাত্রা
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান বিশেষভাবে প্রস্তুত করা লাল রঙের একটি বাসে করে সংবর্ধনা মঞ্চের উদ্দেশে রওনা হন। বাসটির গায়ে লেখা “সবার আগে বাংলাদেশ” – যা দলের মূল শ্লোগান।
জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে নামে পরিচিত রাস্তা ধরে বাসটি এগিয়ে যাওয়ার সময় উভয় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ তাকে স্বাগত জানান।
পূর্বাচল মঞ্চে ঐতিহাসিক ভাষণ
পূর্বাচলের সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছে তারেক রহমান লক্ষ জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আসন্ন নির্বাচন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মায়ের সাথে সাক্ষাৎ
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর তারেক রহমান সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন তার মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে। ২৩ নভেম্বর থেকে খালেদা জিয়া এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দীর্ঘদিন পর মা-ছেলের এই মিলন হবে অত্যন্ত আবেগঘন। তাই বিমানবন্দর ও এভারকেয়ার হাসপাতালের কাছাকাছি জায়গা থেকে সংবর্ধনার স্থান নির্বাচন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার
তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবর বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছে। কাতারভিত্তিক আল জাজিরা এবং ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো তার প্রত্যাবর্তনের খবর গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করেছে।
আল জাজিরার শিরোনাম ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরলেন বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা। রয়টার্স তাকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করে নির্বাচনের আগে তার এই প্রত্যাবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে।
১৭ বছরের ইতিহাস
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় আটক হন তারেক রহমান। প্রায় ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে চলে যান।
সে বছরের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশে আসার পথ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায় তার। একের পর এক মামলায় জর্জরিত হন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিএনপি নেতারা বলছেন, তার উপস্থিতি দলকে আরও শক্তিশালী করবে এবং নির্বাচনে জয়ের পথ সুগম করবে।
লন্ডনে ১৭ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছিলেন, “ইনশাআল্লাহ, আমি আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে যাবো।”
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ) দায়িত্ব পালন করছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যাত্রী ছাড়া অন্য কাউকে টার্মিনালে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সম্ভাব্য যানজটের কথা মাথায় রেখে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস যাত্রীদের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছানোর অনুরোধ জানিয়েছিল।
এছাড়া বৃহস্পতিবার ঢাকার বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে থেকেও নেতা-কর্মীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
জনতার প্রতিক্রিয়া
“মা-মাটি ডাকছে, তারেক রহমান আসছে”, “বীরের বেশে তারেক রহমান, আসবে এবার বাংলাদেশে” – এমন শত শত শ্লোগানে মুখরিত ছিল রাজধানী। বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়েছে। রাস্তায় মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে—জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না, আর মজলুমের জয় অনিবার্য।”
এখন তিনি থাকবেন কোথায়?
তারেক রহমান গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাসায় উঠবেন বলে জানা গেছে। এই বাসার পাশেই ‘ফিরোজা’ বাসভবন, যেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কয়েক বছর ধরে থাকছেন।
পরবর্তী কর্মসূচি
বিএনপি সূত্র জানায়, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে তারেক রহমানের ব্যাপক বৈঠক হবে। নির্বাচনী প্রস্তুতি, দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।
দলের নেতারা বলছেন, শীঘ্রই তিনি দেশব্যাপী সফরে যাবেন এবং জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করবেন।
লন্ডনে আলোচনা সভায় তিনি ৩১ দফা পরিকল্পনা এবং ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তার রূপরেখা দিয়েছেন।
উপসংহার
১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে এবং আসন্ন নির্বাচনে কী ভূমিকা রাখবে – তা নিয়ে এখন সবার দৃষ্টি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, যিনি অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক, বলেছেন তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশের উন্নয়নে এই প্রত্যাবর্তন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
•আরও পড়ুন:
•তারেক রহমানের আগমনে পূর্বাচলে লাখো মানুষের সমাবেশ
•আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তারেক রহমানের দেশে ফেরা
•খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের আবেগঘন সাক্ষাৎ
•Jabara News 24 – সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদের অঙ্গীকার

Leave a comment