দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনায় ভারতীয় হোটেলে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ

নয়াদিল্লি-ঢাকা, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | Jabara News 24 আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলার হোটেল মালিকরা বাংলাদেশি নাগরিকদের রুম দিতে অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই নিষেধাজ্ঞা এতটাই কঠোর যে চিকিৎসা ভিসায় আসা রোগীদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে।
সিলিগুড়ি, মালদা ও দার্জিলিংয়ে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
পশ্চিমবঙ্গের সিলিগুড়ি, মালদা এবং দার্জিলিং জেলার হোটেল মালিক সমিতিগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গ্রেটার সিলিগুড়ি হোটেলিয়ার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক উজ্জ্বল ঘোষ জানান, সংস্থার নির্বাহী কমিটির ভোটে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
উজ্জ্বল ঘোষ বলেন, “আমাদের ৯৭ শতাংশ সদস্য এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।”
সিলিগুড়ির প্রায় ৩০০টি হোটেল এবং মালদা ও দার্জিলিংয়ের ১৮০টির বেশি হোটেল এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। হোটেলগুলোর সামনে “বয়কট বাংলাদেশ” লেখা পোস্টার টাঙানো হয়েছে।
চিকিৎসা ভিসাধারীদেরও ছাড় নেই
প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা এবং শিক্ষা ভিসাধারীদের ছাড় দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করা হয়। মালদা হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু চৌধুরী জানান, সংস্থার সব সদস্য সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশিদের রুম বরাদ্দ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সিলিগুড়ির জংশন এলাকার এক হোটেল ম্যানেজার দিলীপ মল্লিক স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের দেশের স্বার্থই সবার আগে। ব্যবসার চেয়ে জাতীয় মর্যাদা বড়।”
ত্রিপুরাতেও অনুরূপ পদক্ষেপ
ত্রিপুরার অল ত্রিপুরা হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ মালিক সমিতিও (এটিএইচআরওএ) ২ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য হোটেল ও রেস্তোরাঁ সেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
সমিতির সম্পাদক ভাস্কর চক্রবর্তী জানান, “২ ডিসেম্বরের আগে চেক-ইন করা বাংলাদেশি নাগরিকরা থাকতে পারবেন, তবে নতুন বুকিং নেওয়া হবে না। শুধুমাত্র জটিল চিকিৎসার জন্য যথাযথ ডকুমেন্টসহ কেউ এলে তাকে রুম দেওয়া হতে পারে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও কঠোর দাবি
শুধু হোটেল নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। সিলিগুড়ির ব্যবসায়ী সুজন দাস বলেন, “আমরা চাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমস্ত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হোক। পরিবহন, হোটেল, পণ্য বিক্রয় এমনকি চিকিৎসা সুবিধাও বাংলাদেশি নাগরিকদের দেওয়া বন্ধ করা উচিত।”
স্থানীয় চেম্বার অব কমার্স এই হোটেল মালিক সমিতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
হোটেল মালিকরা এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন:
১. সংখ্যালঘু নির্যাতন: বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলমান সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা।
২. ভারতীয় পতাকা অসম্মান: বাংলাদেশে ভারতীয় জাতীয় পতাকা অসম্মানের অভিযোগ এবং ভারতবিরোধী মনোভাব প্রদর্শন।
৩. চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার: বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর গ্রেপ্তার।
৪. দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড: বাংলাদেশে একজন হিন্দু শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের হত্যা ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
৫. রাজনৈতিক অস্থিরতা: বাংলাদেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভারতবিরোধী বক্তব্য।
বাংলাদেশের পাল্টা পদক্ষেপ
এই পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে নয়াদিল্লি ও আগরতলায় কনস্যুলার ও ভিসা সেবা স্থগিত করেছে। ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের সামনেও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।
পর্যটন ও চিকিৎসা খাতে প্রভাব
সিলিগুড়ি উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এবং প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক এখানে আসেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
গত কয়েকদিনে মাত্র ১০ জন বাংলাদেশি সিলিগুড়িতে এসেছিলেন, প্রধানত চিকিৎসা বা শিক্ষার উদ্দেশ্যে। এখন তাদেরও হোটেল পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসা পর্যটন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি জটিল চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। এই নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্য মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
জাতীয় সরকারের অবস্থান
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখনও এই স্থানীয় হোটেল মালিকদের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বহিরাঙ্গন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের অবস্থা
বৈধ ভারতীয় ভিসা থাকলেও বাংলাদেশিরা এখন সিলিগুড়ি শহরে প্রবেশ করতে পারলেও হোটেল বা স্থানীয় পরিবহন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সেবাদানকারীরা সক্রিয়ভাবে ব্যবসা প্রত্যাখ্যান করছেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নতুন নীতিতে শিক্ষার্থী ভিসাধারীদের জন্য আগের ছাড়ও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের সম্মিলিত বয়কটকে বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সাধারণ নাগরিক ও রোগীদের ভোগান্তির শিকার হওয়া উচিত নয়।
সিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব
সিলিগুড়ি করিডোর, যা “চিকেনস নেক” নামেও পরিচিত, ভারতীয় মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে সংযুক্ত করে। এর কৌশলগত গুরুত্ব একে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি সংবেদনশীল বিষয় করে তোলে।
উপসংহার
এই নিষেধাজ্ঞা দেখাচ্ছে কীভাবে কূটনৈতিক উত্তেজনা সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের তৃণমূল পর্যায়ের বয়কট দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং সাধারণ মানুষ, বিশেষত চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা: কী হচ্ছে?
চিকিৎসা পর্যটনে বাংলাদেশি নির্ভরতা: বিকল্প কী?
সংখ্যালঘু সুরক্ষা: দুই দেশের দায়িত্ব
Jabara News 24 – সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদের অঙ্গীকার

Leave a comment