বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল

ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | Jabara News 24 প্রতিবেদকবিএনপি চেয়ারপার্সন ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এই মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করেছেন।মৃত্যুর মুহূর্তে পরিবার ও নেতৃবৃন্দমৃত্যুর সময় হাসপাতালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, ছোট ছেলের বউ শার্মিলী রহমান সিঁথি, ভাই শামীম ইসকান্দার, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ সব আত্মীয়স্বজন এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপস্থিত ছিলেন।মেডিকেল বোর্ডের সকল চিকিৎসকবৃন্দও তখন উপস্থিত ছিলেন। ফজরের নামাজের ঠিক পরপরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।দীর্ঘ রোগভোগের শেষেবেগম খালেদা জিয়া গত ২৩ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সোমবার রাতে তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে পড়ে এবং লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতাসহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, তার বয়স এবং সামগ্রিকভাবে খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে একসঙ্গে একাধিক চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছিল না।গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী: এক ঐতিহাসিক যাত্রা১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণকারী খালেদা জিয়া শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, বিশ্বের প্রথম নারী যিনি একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেছেন।মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভকালে তিনি কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন এবং ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে মুক্তি পান। রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ।১৯৮১ সালের ৩০ মে স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে তার জীবন বদলে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর দলীয় নেতাদের আহ্বানে তিনি বিএনপির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।তিনবার প্রধানমন্ত্রীনব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন:প্রথম মেয়াদ: ১৯৯১-১৯৯৬দ্বিতীয় মেয়াদ: ১৯৯৬ (স্বল্প সময়)তৃতীয় মেয়াদ: ২০০১-২০০৬তার শাসনামলে বাংলাদেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার হয়। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।চড়াই-উতরাইয়ের রাজনৈতিক জীবনদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া বহুবার কারাবরণ করেছেন এবং অসংখ্য চড়াই-উৎরাই পার করেছেন। তবে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সর্বদা অবিচল।২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় তিনি আইনি জটিলতার মধ্যে ছিলেন। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল, যা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অবমুক্ত করা হয়।VVIP ঘোষণা ও বিশেষ নিরাপত্তা২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সরকার তাকে VVIP ঘোষণা করে এবং তার নিরাপত্তার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। তার শারীরিক অবস্থা তখন থেকেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে ছিল।রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়াবেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এটি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি বলেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন মহান নেত্রীকে হারালো।অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শোক জানিয়েছেন।বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, মহান আল্লাহ তার ওপর রহম করুন এবং তাকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু তাকে বাংলাদেশের আপসহীন কিংবদন্তি নেত্রী বলে উল্লেখ করেছেন।জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তার সাহসী নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে দেশের মানুষকে পথ দেখিয়েছে।আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারবিবিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন। তারা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে ২০ বছরের মধ্যে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী সরকার প্রধান হন।আল জাজিরা, রয়টার্স, এএফপিসহ বিশ্বের প্রধান গণমাধ্যমগুলো তার মৃত্যু সংবাদ প্রধান শিরোনামে প্রচার করেছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ঢেউফেসবুক, টুইটার (এক্স) সহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের ঢেউ বইছে। সর্বসাধারণ জনগণ তাদের নিজেদের প্রোফাইলে তার ছবি শেয়ার করে শোক প্রকাশ করছেন এবং মাগফিরাতের দোয়া করছেন।জানাজার সময়সূচিমরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার সময়সূচি এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে জানানো হবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানিয়েছে।দলের নেতারা জানিয়েছেন, যথাযথ মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে। দেশবাসী এবং দলের লাখো নেতা-কর্মী তাদের প্রিয় নেত্রীর শেষ দেখা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।একটি যুগের অবসানবেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান ঘটল। একজন গৃহবধূ থেকে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া এই নারী তার অদম্য সাহস, দৃঢ়তা এবং জনগণের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।তার রাজনৈতিক আদর্শ এবং গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।শেষকথাবাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের সরকার প্রধান, গণতন্ত্রের সংগ্রামী সৈনিক বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে সমগ্র জাতি।ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।মহান আল্লাহ তার রূহের মাগফিরাত করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

Leave a comment