
ঢাকা, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ | Jabara News 24 আন্তর্জাতিক ডেস্কখালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক বুধবার ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় হ্যান্ডশেক করেছেন। মে ২০২৫ সালে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের পর এটি প্রথম উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ।বাংলাদেশ সংসদে ঐতিহাসিক মুহূর্তবাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় জানাজায় অংশ নিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ঢাকায় এসেছিলেন। বাংলাদেশ সংসদ ভবনের একটি অপেক্ষা কক্ষে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাতের পর জয়শঙ্কর হেঁটে আয়াজ সাদিকের দিকে এগিয়ে যান এবং হ্যান্ডশেক করেন।বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এই মুহূর্তের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে লেখেন, “পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বুধবার ঢাকায় সাবেক বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠানের আগে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন।”আয়াজ সাদিকের বর্ণনাপাকিস্তানের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বুধবার রাতে সাদিক এই সাক্ষাতের বিবরণ দিয়ে বলেন, “তিনি আমার কাছে হেঁটে এসে হ্যালো বললেন, যখন আমি দাঁড়ালাম, তখন তিনি নিজের পরিচয় দিলেন এবং হাসি দিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। আমি যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি বললেন, ‘মাননীয়, আমি জানি আপনি কে এবং পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।'”সাদিক আরও জানান, জয়শঙ্কর প্রথমে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তারপর তার কাছে আসেন। তিনি বলেন, জয়শঙ্কর জানতেন যে ক্যামেরা রয়েছে এবং তার আচরণ ইচ্ছাকৃত ছিল।পাকিস্তানের প্রেস বিবৃতিপাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সচিবালয় একটি প্রেস বিবৃতি জারি করে বলেছে, “ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. এস জয়শঙ্কর জাতীয় পরিষদের স্পিকারের কাছে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করেন। এই মিথস্ক্রিয়ার সময়, ডা. এস জয়শঙ্কর স্পিকারের কাছে নিজের পরিচয় দেন এবং স্পিকারকে বলেন যে তিনি তাকে চিনতে পেরেছেন।”বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়, পাহালগাম হামলার পর থেকে পাকিস্তান ক্রমাগত সংলাপ, সংযম এবং সহযোগিতামূলক পদক্ষেপের উপর জোর দিয়ে আসছে, যার মধ্যে শান্তি আলোচনা এবং কথিত মিথ্যা ফ্ল্যাগ পাহালগাম ঘটনার যৌথ তদন্তের প্রস্তাবও রয়েছে।ভারতের প্রতিক্রিয়া: “শুধু সৌজন্য”ভারতীয় কর্মকর্তারা এই সাক্ষাতকে একটি আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তারা স্পষ্ট করেছেন যে এটি ছিল একটি শোক অনুষ্ঠানে সাধারণ শিষ্টাচার।ভারতীয় সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তান এই সাধারণ সৌজন্যকে অতিরঞ্জিত করে কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ভারত জানিয়েছে যে এই সাক্ষাতের ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উপর কোনো প্রভাব নেই।ভারত বলেছে, একটি গম্ভীর ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক মোড় দেওয়া অনুচিত। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে শান্তি ও সংলাপের কথা বলে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত বিষয়ে তাদের অবস্থান ভিন্ন।

মে ২০২৫ সালের সামরিক সংঘর্ষ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন নিম্নতম পর্যায়ে নেমে যায়। এরপর মে মাসে চার দিনের সামরিক সংঘর্ষ সংঘটিত হয়, যা অপারেশন সিন্দুর নামে পরিচিত।এই ঘটনার পর থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একে অপরের সাথে প্রকাশ্যে হ্যান্ডশেক বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত মিথস্ক্রিয়া এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুষ্ঠানেও তারা পরস্পরকে এড়িয়ে চলতেন।ক্রিকেট কূটনীতিও ব্যর্থরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের পুরুষ, মহিলা এবং অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল সম্প্রতি পাকিস্তান সফর প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তান দলও ভারতে খেলতে অস্বীকার করে।এই পটভূমিতে জয়শঙ্করের হ্যান্ডশেক অনেকের কাছে একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।পাকিস্তানে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াপাকিস্তানি বিশ্লেষকরা এই সাক্ষাতকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সায়েদ আল জাজিরাকে বলেছেন, “জয়শঙ্কর এবং আয়াজ সাদিকের মধ্যে এই মিথস্ক্রিয়া নতুন বছরের জন্য একটি স্বাগতযোগ্য উন্নয়ন বলে মনে করি।”তিনি বলেন, “সম্পর্কের মৌলিক স্বাভাবিকতা যেখানে কর্মকর্তাদের সম্মান দেওয়া হয় এবং হ্যান্ডশেক করা হয়, এটি ন্যূনতম যা দুর্ভাগ্যবশত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের পর অনুপস্থিত ছিল।”পাকিস্তানি গণমাধ্যম এই হ্যান্ডশেককে ভারত-পাকিস্তান সংলাপের একটি ভালো সূচক হিসেবে তুলে ধরেছে।ভারতে মিশ্র প্রতিক্রিয়াভারতীয় ভাষ্যকাররা এই মিথস্ক্রিয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। কেউ কেউ মনে করেন এটি পাকিস্তানকে ভুল সংকেত দিতে পারে। তবে অনেকেই একমত যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা উচিত।আত্মবিশ্বাস-নির্মাণ পদক্ষেপ অব্যাহতএই হ্যান্ডশেকের পাশাপাশি, নিয়মিত আত্মবিশ্বাস-নির্মাণ পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরকে পারমাণবিক স্থাপনা এবং বন্দীদের তালিকা প্রদান করেছে, যা একটি প্রচলিত কূটনৈতিক অনুশীলন।২০২৬ সালে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা?বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হ্যান্ডশেক সম্ভবত তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক অগ্রগতি আনবে না, তবে এটি দুই দেশের মধ্যে হিমায়িত সম্পর্কে সামান্য উষ্ণতার ইঙ্গিত দিতে পারে।যদিও দুই দেশের মধ্যে মূল বিরোধগুলো অমীমাংসিত রয়েছে – কাশ্মীর সমস্যা, সন্ত্রাসবাদ, এবং সীমান্ত সংঘর্ষ – তবুও মৌলিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার পুনর্নির্মাণ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।বাংলাদেশের ভূমিকাখালেদা জিয়ার জানাজা একটি নিরপেক্ষ মঞ্চ প্রদান করেছে যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা মিলিত হতে পেরেছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই ছবি প্রকাশ করে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজের ভূমিকা তুলে ধরেছে।মুহাম্মদ ইউনূস সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সহযোগিতা প্রচারে আগ্রহী, এবং এই ধরনের মিথস্ক্রিয়া তাদের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির আশাদক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভারত-পাকিস্তান শান্তি চান। একটি ছোট হ্যান্ডশেক হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পরিবর্তন করবে না, তবে এটি দেখায় যে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি।পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?এখন প্রশ্ন হলো, এই হ্যান্ডশেকের পরবর্তী কী হবে? দুই দেশ কি আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু করবে? নাকি এটি শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকবে?রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আসন্ন নির্বাচন সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হতে পারে। তবে এই ধরনের ছোট কূটনৈতিক আচরণ ভবিষ্যতে বড় সংলাপের পথ প্রশস্ত করতে পারে।উপসংহারঢাকায় জয়শঙ্কর এবং আয়াজ সাদিকের হ্যান্ডশেক ২০২৬ সালের শুরুতে একটি প্রতীকী মুহূর্ত। এটি প্রমাণ করে যে সবচেয়ে তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীরাও কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখতে পারে।দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হ্যান্ডশেক হয়তো একটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু কখনও কখনও দীর্ঘ যাত্রা ছোট পদক্ষেপ দিয়েই শুরু হয়।