১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ২,৫৮২ প্রার্থী ও চ্যালেঞ্জ

ঢাকা, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ | Jabara News 24 রাজনীতি ডেস্কগণঅভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো।২,৫৮২ প্রার্থীর মহাসমর: মনোনয়ন জমা শেষ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৫টায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দেশের ৩০০টি আসনে মোট ২,৫৮২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে ঢাকা বিভাগে। মজার ব্যাপার হলো, রবিবার পর্যন্ত মাত্র ১৬৬টি মনোনয়নপত্র জমা পড়লেও সোমবার শেষ দিনে অধিকাংশ প্রার্থী তাদের কাগজপত্র জমা দেন।মনোনয়ন যাচাই চলছে: ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত৩০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া মনোনয়নপত্র যাচাই প্রক্রিয়া আজ ৪ জানুয়ারি (রবিবার) শেষ হবে। রিটার্নিং অফিসাররা প্রতিটি মনোনয়নপত্র খতিয়ে দেখছেন এবং অযোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।এরই মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বগুড়া-৬ আসনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ দুটি আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।নির্বাচন সময়সূচি এক নজরেনির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন ১১ ডিসেম্বর টেলিভিশনে ভাষণে নির্বাচনের সম্পূর্ণ সময়সূচি ঘোষণা করেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো:মনোনয়নপত্র জমা: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ (শেষ)মনোনয়ন যাচাই: ৩০ ডিসেম্বর – ৪ জানুয়ারি ২০২৬আপিল দাখিল: ৫ – ৯ জানুয়ারি ২০২৬আপিল নিষ্পত্তি: ১২ – ১৮ জানুয়ারিপ্রার্থিতা প্রত্যাহার: ২০ জানুয়ারি (শেষ দিন)চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা: ২১ জানুয়ারিপ্রতীক বরাদ্দ: ২২ জানুয়ারিপ্রচারণা শুরু: ২২ জানুয়ারিপ্রচারণা শেষ: ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭:৩০ভোটগ্রহণ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬আপিল প্রক্রিয়া শুরুমনোনয়ন যাচাইয়ে যারা বাদ পড়বেন বা অন্যদের মনোনয়ন নিয়ে আপত্তি থাকবে, তারা ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন।নির্বাচন কমিশন নির্বাচন ভবনে ১০টি বুথ স্থাপন করেছে ১০টি অঞ্চল (আট বিভাগ এবং কুমিল্লা ও ফরিদপুর অঞ্চল) থেকে আপিল গ্রহণের জন্য। কমিশন ১৮ জানুয়ারির মধ্যে সব আপিলের নিষ্পত্তি করবে।নারী প্রার্থীর ব্যাপক বৃদ্ধিএবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। বিশেষত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং বিএনপি থেকে অনেক নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।

যে দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেবিএনপি – প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীবেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ১৭ বছরের নির্বাসনের পর দেশে ফিরে তারেক রহমান সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।বিএনপি চারটি আসনে কোনো প্রার্থী দিচ্ছে না: সিলেট-৫, নীলফামারী-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এবং নারায়ণগঞ্জ-৪। এই আসনগুলোতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম প্রার্থী দিবে।জামায়াতে ইসলামী – নতুন জোটজামায়াতে ইসলামী ২৮ ডিসেম্বর লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সাথে নির্বাচনী জোট ঘোষণা করেছে। প্রথম আলো জানিয়েছে, জামায়াতের প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকার প্রায় ৮০ শতাংশ প্রার্থী নতুন, যাদের আগে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা নেই।ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) – নতুন শক্তিজুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপি সংবিধান প্রণয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং নতুন সংবিধানের দাবিতে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের অনানুষ্ঠানিক স্লোগান: “এবার জনগণ চায়, সংবিধান পরিষদ নির্বাচন” এবং “বাংলাদেশের সমাধান, নতুন সংবিধান”।এনসিপি ৬ নভেম্বর থেকে প্রথম দল হিসেবে মনোনয়ন ফরম ইশু করে। শ্রমিক-কৃষক এবং জুলাই বিপ্লবে আহত প্রতিবাদকারীদের জন্য ৮০ শতাংশ ছাড় রাখা হয়। দৈনিক যুগান্তর জানিয়েছে, এনসিপির প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাথমিক মনোনীত প্রার্থী দলের সদস্য নন।আওয়ামী লীগ অনুপস্থিতটানা চারবার নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ বর্তমানে স্থগিত অবস্থায় রয়েছে এবং এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর দল নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে।কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ বয়কটবঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।জুলাই সনদ গণভোট: ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তনির্বাচনের সাথে সাথে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই গণভোটে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনঃসুবিবন্যাসের লক্ষ্যে মূল সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হবে কিনা।গণভোটের ব্যালট পেপার হবে গোলাপি রঙের, আর নির্বাচনের ব্যালট পেপার হবে সাদা-কালো। উভয় ব্যালট একটি মাত্র ব্যালট বক্সে ফেলা হবে।নির্বাচনী প্রস্তুতিভোটার ও কেন্দ্রনির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রায় ১২.৭৬ কোটি ভোটারের জন্য ৪২,৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং ২,৪৪,৭৩৯টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে।ভোট গ্রহণের সময়এবার ভোটগ্রহণ চলবে সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত, যা স্বাভাবিকের চেয়ে এক ঘণ্টা বেশি। কারণ ভোটারদের নির্বাচন এবং গণভোট উভয়ে ভোট দিতে হবে।প্রবাসীদের ভোটপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ডাক ভোটের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২,৯৭,০০০ প্রবাসী নিবন্ধন করেছেন। তাদের ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নাম না থেকে শুধু দল ও স্বতন্ত্র প্রতীক থাকবে। ভোট শেষ হওয়ার আগেই রিটার্নিং অফিসারের কাছে তাদের ব্যালট পৌঁছাতে হবে।নতুন নিয়মএবার সব প্রার্থীকে অথবা তাদের প্রস্তাবক বা সমর্থককে ব্যক্তিগতভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয়েছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী প্রচারণা পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগএবার কমিশন ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিয়েছে – দুই বিভাগীয় কমিশনার (ঢাকা ও চট্টগ্রাম), তিন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা) এবং ৬৪ জেলা জেলা উপায়ুক্ত।লাখো কর্মকর্তা – প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার – নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।নির্বাচনী আচরণবিধি বলবৎসময়সূচি ঘোষণার সাথে সাথে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর হয়ে গেছে। উপদেষ্টা এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রচারণার জন্য সরকারি সুবিধা ব্যবহার নিষিদ্ধ। সরকার এমন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন বা উদ্বোধন করতে পারবে না যা ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে।প্রার্থীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সময়সূচি ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাবলিক স্থান থেকে পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার এবং বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলতে।প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানপ্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার ১৩তম জাতীয় নির্বাচনকে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক সুযোগ বলে উল্লেখ করেন এবং জোর দেন যে এটি অবশ্যই সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে হবে।তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন নতুন ভবিষ্যতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমরা একটি আধুনিক, ন্যায়বিচারপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়তে সফল হব।”প্রত্যাশা ও উদ্বেগরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান লড়াই হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।এই ভোট দেশের গণতান্ত্রিক গতিপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার, অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, ভারতের সাথে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ, দুর্নীতি মোকাবেলা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শক্তিশালীকরণ প্রচারণার প্রধান বিষয় হবে।আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকজাতিসংঘ থেকে কমনওয়েলথ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নিয়োগের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তারা কারচুপি রোধে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের উপর জোর দিচ্ছেন।কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ?সাধারণত প্রতি পাঁচ বছরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, গত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচনের মাত্র দুই বছর পরই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, কারণ ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার উৎখাত হয়।২০২৪ সালের নির্বাচন রেকর্ড কম ভোটার উপস্থিতি এবং বিতর্কিত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, ২০২৬ সালের নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাচ্যালেঞ্জ:স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করাসহিংসতা ও কারচুপি প্রতিরোধসব দলের জন্য সমান সুযোগআওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকর্তাদের বিচারসম্ভাবনা:গণতান্ত্রিক শাসন পুনরুদ্ধারঅর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাআন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধিনতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থানউপসংহার১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে।প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, “আমি সব রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করতে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করতে।”এই নির্বাচন শুধু সরকার নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Leave a comment