
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ২০২৬ এর আগে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড BCCI-র সরাসরি নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে BCCI-র সরাসরি নির্দেশ
শনিবার সকালে BCCI সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া এই খবর নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে BCCI কেকেআরকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে। ফ্র্যাঞ্চাইজি চাইলে বিকল্প খেলোয়াড়ের জন্য আবেদন করতে পারবে।”
যদিও তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কারণ উল্লেখ করেননি, তবে “সাম্প্রতিক পরিস্থিতি” বলতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনাকেই বোঝানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৯.২০ কোটি টাকায় কেনা হয়েছিল গত ডিসেম্বরে আইপিএল মিনি অকশনে কেকেআর মুস্তাফিজুর রহমানকে ৯.২০ কোটি টাকায় কিনেছিল, যা তার বেস প্রাইস ২ কোটি টাকার চেয়ে অনেক বেশি। চেন্নাই সুপার কিংস এবং দিল্লি ক্যাপিটালসের সাথে তুমুল বিডিং যুদ্ধের পর তাকে স্কোয়াডে নেওয়া হয়। এটি ছিল আইপিএল ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ মূল্য।
মুস্তাফিজ ছিলেন আইপিএল ২০২৬ অকশনে একমাত্র বাংলাদেশি খেলোয়াড়, যাকে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনেছিল। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপ মুস্তাফিজকে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলমান সহিংসতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়।বিজেপি
নেতা কৌস্তভ বাগচি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “যদি কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটার কলকাতায় ম্যাচ খেলতে চায়, আমরা তা হতে দিব না। শাহরুখ খানকেও কলকাতায় ঢুকতে দেব না।”
হিন্দু ধর্মীয় নেতারাও কেকেআরের মালিক শাহরুখ খানকে “দেশদ্রোহী” বলে আখ্যায়িত করেন এবং মুস্তাফিজকে স্কোয়াডে রাখার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
গত মাসে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এরপরই মুস্তাফিজের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জোরালো হয়। কেকেআর-এর বিবৃতি
শনিবার সন্ধ্যায় কেকেআর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে নিশ্চিত করে যে তারা BCCI-র নির্দেশ মেনে মুস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “কলকাতা নাইট রাইডার্স নিশ্চিত করছে যে BCCI/IPL, লিগের নিয়ন্ত্রক হিসেবে, আসন্ন আইপিএল মৌসুমের আগে মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে নির্দেশ দিয়েছে। বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার নির্দেশে যথাযথ প্রক্রিয়া এবং পরামর্শের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। আইপিএল নিয়ম অনুযায়ী BCCI কলকাতা নাইট রাইডার্সকে একজন বিকল্প খেলোয়াড় নিতে অনুমতি দেবে এবং যথাসময়ে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।”মুস্তাফিজের প্রতিক্রিয়া স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ার পর মুস্তাফিজুর রহমান BDcrictime-কে বলেছেন, “যখন তোমাকে বাদ দেওয়া হয়, আর কী-ই বা করতে পারো?”বর্তমানে
তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (BPL) রংপুর রাইডার্সের হয়ে খেলছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) এ বিষয়ে শীঘ্রই বিবৃতি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইপিএল নিয়ম ও ক্ষতিপূরণ আইপিএল নিয়ম অনুযায়ী, অকশনের পর শুধুমাত্র আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিল, BCCI অথবা খেলোয়াড় নিজে চাইলেই চুক্তি বাতিল করতে পারেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি নিজে থেকে কোনো খেলোয়াড়কে বাদ দিতে পারে না। এই পরিস্থিতিকে “ফোর্স ম্যাজিউর” ইভেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে খেলোয়াড় এবং ফ্র্যাঞ্চাইজির নিয়ন্ত্রণের বাইরের কারণে চুক্তি বাতিল হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজি সাধারণত সম্পূর্ণ অকশন মূল্য ফেরত পায়। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, কেকেআর সম্ভবত পুরো ৯.২০ কোটি টাকা ফেরত পাবে, যা তাদের বাজেটে ফিরিয়ে দিয়ে বিকল্প খেলোয়াড় কিনতে সাহায্য করবে। কেকেআর-এর বোলিং আক্রমণে প্রভাব মুস্তাফিজের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়া কেকেআরের বোলিং ডিপার্টমেন্টে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। বিশেষত ডেথ ওভারে তার দক্ষতার জন্য তাকে কেনা হয়েছিল। আইপিএল ক্যারিয়ারে মুস্তাফিজ ৬৫টি উইকেট নিয়েছেন ২৮.৪৪ গড়ে এবং ৮.১৩ ইকোনমি রেটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৩৬০টির বেশি উইকেট নিয়েছেন। T20 ক্যারিয়ারে ৩১৫ ম্যাচে তার ৪০২ উইকেট রয়েছে। কাকে নেবে কেকেআর?
কেকেআর এখন বিকল্প পেসার খুঁজছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা সম্ভাব্যভাবে নিম্নলিখিত খেলোয়াড়দের টার্গেট করতে পারে:জেসন
বেহরেনডর্ফ (অস্ট্রেলিয়া) – অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার টি নাটারাজান (ভারত) – ডেথ ওভার স্পেশালিস্ট অ্যাডাম মিল্নে (নিউজিল্যান্ড) – দ্রুতগতির পেসার ওয়াইন ফেল্পস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) – আক্রমণাত্মক ফাস্ট বোলার T20 বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে প্রশ্ন এই ঘটনার পর T20 বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ দল গ্রুপ পর্যায়ে কলকাতায় তিনটি এবং মুম্বাইয়ে একটি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে । বাংলাদেশ
ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, “আইসিসি বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, হোস্ট ভারত। যদি কারো সাথে যোগাযোগ করতে হয়, তাহলে আমাদের আইসিসির সাথে কথা বলতে হবে।”
ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ
মজার ব্যাপার হলো, BCCI-র এই সিদ্ধান্তের ঠিক আগের দিন BCB ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার ঘোষণা করেছে, যেখানে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভারত বাংলাদেশ সফরে যাবে তিন ওডিআই এবং তিনটি T20I খেলতে। এই সিরিজ মূলত ২০২৫ সালে হওয়ার কথা থাকলেও পরে পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
BCCI-র এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি নেতা সংগীত সিং সোম বলেছেন, “শাহরুখ খান বুঝে গেছেন সনাতনীদের বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়।”
তবে অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক এবং সাবেক ক্রিকেটার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। একজন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার বলেছেন, “রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ক্রিকেটের জন্য ভালো নয়।”
উপসংহার
মুস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল থেকে বাদ পড়ার ঘটনা দেখাচ্ছে কীভাবে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইশু ক্রিকেটের মতো খেলায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনার এটি একটি প্রত্যক্ষ ফলাফল।
এই ঘটনা বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ভবিষ্যতে আইপিএলে খেলার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।