Tag Archives: #ProbasheVote

প্রবাসীদের ভোটের নতুন সুযোগ: ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ

ঢাকা, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ | Jabara News 24 প্রবাস ডেস্ক
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) চালু করেছে যুগান্তকারী ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ, যার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রবাসীরা তাদের মূল্যবান ভোট প্রদান করতে পারবেন।
রেকর্ড সাড়া: ১৩ লাখের বেশি নিবন্ধন
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে মোট নিবন্ধন করেছেন ১৩ লাখ ১৩ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১১ লাখ ২৬ হাজার ২৭৭ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৩৪ জন। প্রবাসীদের এই ব্যাপক সাড়া নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় সফলতা বলে বিবেচিত হচ্ছে।
আগ্রহের বিষয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকেও ৫ লাখ ৯০ হাজার ৪৯৯ জন সরকারি চাকরিজীবী এবং নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। বাকি ৭ লাখের বেশি নিবন্ধন এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে।
নিবন্ধনের সময়সীমা বৃদ্ধি
প্রবাসীদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৫ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত করেছে। ৩০ ডিসেম্বর বিকেলে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সময়সীমা বৃদ্ধির ফলে আরও কয়েক লাখ প্রবাসী নিবন্ধন করার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইসির লক্ষ্য রয়েছে আগামী নির্বাচনে ৫০ লাখ প্রবাসী ভোট টানার।
কীভাবে কাজ করবে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ?
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি প্রবাসী ভোটারদের জন্য একটি সহজ এবং নিরাপদ ভোটিং সমাধান। নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং নিরাপদ। প্রবাসীদের নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
নিবন্ধন প্রক্রিয়া:
১. প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ ডাউনলোড করুন
২. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর দিয়ে লগইন করুন
৩. আন্তর্জাতিক মোবাইল নম্বর প্রদান করুন (বাধ্যতামূলক)
৪. বর্তমান বিদেশি ঠিকানা এবং পাসপোর্ট তথ্য প্রদান করুন
৫. ফেস রিকগনিশন এবং লাইভনেস টেস্ট সম্পন্ন করুন
৬. আবেদন যাচাই ও অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করুন
ভোট প্রদান প্রক্রিয়া:
নিবন্ধন সফল হলে নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের নির্ধারিত ঠিকানায় ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠাবে। ভোটার ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে পুনরায় ডাকযোগে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফেরত পাঠাবেন।
প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ইসির প্রবাসী ভোটার প্রকল্পের টিম লিডার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালীম আহমাদ খান জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে মোবাইল অ্যাপ পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। অ্যাপে জিও লোকেশন চালু থাকার ফলে বাংলাদেশ থেকে কেউ এই অ্যাপ ব্যবহার করতে পারবেন না, যা ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
প্রতিটি প্রবাসীকে অবশ্যই তাদের বর্তমান অবস্থানের আন্তর্জাতিক সিম কার্ড ব্যবহার করতে হবে, যা দ্বৈত ভোট এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে সহায়ক।
১৪৮টি দেশে সক্রিয় অ্যাপ
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি বিশ্বের ১৪৮টি দেশে ব্যবহারযোগ্য। যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন করছেন তার মধ্যে রয়েছে:
সৌদি আরব
সংযুক্ত আরব আমিরাত
কুয়েত
কাতার
ওমান
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাষ্ট্র
কানাডা
অস্ট্রেলিয়া
মালয়েশিয়া
সিঙ্গাপুর
জাপান
দক্ষিণ কোরিয়া
ইতালি
স্পেন
এছাড়াও আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোতেও অ্যাপটি সক্রিয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, “বিশ্বের যেখানেই থাকুন না কেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রবাসীরা এবার ভোট দিতে পারবেন। এটি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে আসছেন। তাদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এখন তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেও সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন।”
ব্যালট পেপার প্রেরণ শুরু
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রবাসী ভোটারদের ঠিকানায় ব্যালট পেপার পাঠানো শুরু করেছে। গত ১২ দিনে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৫ জন প্রবাসী ভোটারের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন টিম লিডার সালীম আহমাদ খান।
তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যালট পৌঁছাতে এবং ভোট প্রদান শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাতে সর্বনিম্ন ১৭ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৩০ দিন সময় লাগতে পারে। এজন্য ইসি পর্যাপ্ত সময় রেখে ব্যালট পাঠানোর কাজ শুরু করেছে।
প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী মোহাম্মদ রফিক বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। এখন দেশে না গিয়েও আমরা আমাদের প্রিয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারব।”
লন্ডনের প্রবাসী শাহিনা আক্তার বলেন, “এটি প্রবাসী নারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই পরিবারের দায়িত্বের কারণে দেশে যেতে পারেন না। এই অ্যাপের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছি।”
অন্যান্য সুবিধাভোগী
শুধু প্রবাসীরাই নয়, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ভোটাররাও পোস্টাল ভোটের এই সুবিধা নিতে পারবেন।
সরকারি চাকরিজীবীরা তফসিল ঘোষণার পর থেকে নিবন্ধন করতে পারছেন এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ এবং প্রস্তুতি
যদিও এই উদ্যোগ একটি বড় অগ্রগতি, তবে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডাক ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা, সময়মত ব্যালট পৌঁছানো এবং ফেরত আসা নিশ্চিত করা একটি বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন কমিশন এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক ডাক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করছে। এছাড়াও প্রতিটি ব্যালটে ট্র্যাকিং নম্বর দেওয়া হচ্ছে যাতে প্রবাসীরা তাদের ভোট কোথায় আছে তা জানতে পারেন।
গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ
বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি প্রবাসী নাগরিক রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখলেও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন প্রথমবারের মতো তারা জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসীদের ভোট দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের বহির্বিশ্বের অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
প্রযুক্তিগত সহায়তা
যেসব প্রবাসী অ্যাপ ব্যবহারে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তাদের জন্য নির্বাচন কমিশন ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন সেবা চালু করেছে। এছাড়াও ইসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (www.ecs.gov.bd), ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলে বিস্তারিত গাইডলাইন এবং টিউটোরিয়াল ভিডিও দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং হাইকমিশনগুলোও প্রবাসীদের সহায়তা প্রদান করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিজয় দিবসের ভাষণে প্রবাসী ভোটারদের ভোটদানের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “প্রবাসীরা বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
সরকার এই প্রকল্পে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করছে এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে অনলাইন ইন্টারনেট ভোটিং এবং প্রক্সি ভোটিং ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি প্রবাসীদের জন্য ভোটদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং দ্রুততর করবে।
এপ্রিল ২০২৫ সালে নির্বাচন কমিশনে “Devising Viable Method(s) for Diaspora Voting” শীর্ষক ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সামাজিক প্রভাব
এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে মাতৃভূমির সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে। অনেক প্রবাসী বলছেন, এই ভোটাধিকার তাদের মধ্যে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রবাসীরা ব্যাপকভাবে এই খবর শেয়ার করছেন এবং একে অপরকে নিবন্ধন করতে উৎসাহিত করছেন।
শেষ মুহূর্তের আবেদন
নির্বাচন কমিশন যেসব প্রবাসী এখনও নিবন্ধন করেননি তাদের ৫ জানুয়ারির মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে। সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে সকল যোগ্য প্রবাসীর নিবন্ধন করা উচিত।
যারা প্রযুক্তিগত সহায়তা চান তারা নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা নিকটস্থ বাংলাদেশ মিশনে যেতে পারেন।
উপসংহার
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির ভোটাধিকার নিশ্চিত করা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
১৩ লাখেরও বেশি প্রবাসীর নিবন্ধন প্রমাণ করে যে তারা দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের ভোট দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রবাসীরা এখন শুধু অর্থনৈতিক সহায়তাকারী নন, তারা দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সক্রিয় অংশীদার। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা।
দ্রুত তথ্য
নিবন্ধনের শেষ তারিখ: ৫ জানুয়ারি ২০২৬
মোট নিবন্ধন: ১৩ লাখ ১৩ হাজার ৪২২ জন (৪ জানুয়ারি পর্যন্ত)
অ্যাপ নাম: পোস্টাল ভোট বিডি
ওয়েবসাইট: http://www.ecs.gov.bd
সক্রিয় দেশ: ১৪৮টি
ব্যালট প্রেরণ শুরু: ডিসেম্বর ২০২৫
নির্বাচনের তারিখ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (প্রথমার্ধ)